Breaking News

ছাগলকে জরিমানা করা সেই ইউএনও বদলি!

একটি ছাগলকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা বগুড়ার সেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলি করা হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। গতকাল মঙ্গলবার বগুড়ার জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক ওই বদলির নোটিশ পেয়েছেন। আজ বুধবার তিনি সেটা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা চত্বরে ফুল গাছের পাতা খাওয়ার অভিযোগে একটি ছাগলের দরিদ্র মালিককে ভ্ৰাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন আদমদিঘীর ইউএনও সীমা শারমিন।

ছাগলের মালিক সাহারা বেগম জানিয়েছিলেন যে, ভ্রাম্যমাণ আদালত তার সামনে পরিচালিত হয়নি। এই জরিমানার কথা তিনি জানতে পেরেছেন ইউএনও’র বাড়ির কাজের লোকের মাধ্যমে, সেটিও ছাগলটি আটকের তিন দিন পরে।

ছাগলের মালিক যেহেতু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, সুতরাং তিনি কোনো দোষও স্বীকার করেননি। ফলে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের যে বিধি, সেটা ভঙ্গ হয়েছে এবং এই জরিমানাটা ছাগলের মালিককে নয় বরং সেই ছাগলকেই করা হয়েছে। গত ১৭ মে ছাগলটিকে উপজেলা

চত্বরের ফুল গাছের পাতা খাওয়ার জন্য আটকানো হয়েছিল। গণমাধ্যমের খবরে, সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। ১০ দিন পর ২৭ মে স্থানীয় সাংবাদিক এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে ইউএনও সেই ছাগলটিকে তার মালিকের কাছে হস্তান্তর করেন।

ইউএনও’র বদলির বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক জানিয়েছেন, সীমা শারমিনের এই বদলি আসলে রেগুলার (সাধারণ) বদলি। এটা কোনো শাস্তিমূলক বদলি নয়। ছাগলকাণ্ড বা ছাগলের জরিমানার ঘটনার সঙ্গে তার এই বদলির কোনো সম্পর্ক নেই। এখন প্রশ্ন হলো, এই বদলি কি তার শাস্তি না দায়মুক্তি?

ইউএনও সীমা শারমিন আদমদীঘি উপজেলায় যোগ দিয়েছিলেন ২০২০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। কেন তার এক বছর না হতেই বদলি করা হলো? ডিসি সেই প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন যে, এটা স্থানীয় মন্ত্রণালয়ের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। এটা মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে। অর্থাৎ সীমা শারমিনকে কী কারণে এত তাড়াতাড়ি বদলি করার হলো, তার সুনির্দিষ্ট কারণ বলা হলো না।

এখন আসি মূল আলোচনায়। ছাগল মালিকের অভিযোগ, একজন ইউএনও শুধু ফুল গাছের পাতা খাওয়ার জন্য তার অনুপস্থিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। এরপর পাঁচ দিনের মাথায় সাহারা বেগম জানতে পারলেন যে, স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে ছাগলটি পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে এবং বাকি তিন হাজার টাকা তাকে উপজেলা পরিষদ থেকে নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। এই বিষয়টি স্থানীয় অনেকেই জানতেন।

গণমাধ্যমের খবর এবং ছাগলের মালিকের কথা অনুযায়ী ইউএনও ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিধি লঙ্ঘন করেছেন। ছাগলকে খোঁয়াড়ে না দিয়ে গণ-উপদ্রব আইনের ধারায় ক্ষমতা প্রয়োগ করে ছাগলের জরিমানা করলেন দুই হাজার টাকা। এসময় ছাগলের মালিকের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনায় আনেননি শাস্তি প্রদানকারী।

জনহিতকর কাজে তাকে সরকার যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তিনি তার প্রয়োগ করলেন। যেটা পরে দেখা গেল, অপরাধের তুলনায় শাস্তির পরিমাণ বেশি হয়েছে। এর কারণে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার কারণে সেই ছাগলটি ফেরত দেওয়া হলো। জরিমানার টাকা দিলেন ইউএনও নিজেই।

এই যে ঘটনাটি ঘটল, এ সম্পর্কে জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক সবাই জানলেন। ইউএনও’র বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিধি লঙ্ঘনের যে অভিযোগ অথবা ছাগল বিক্রির যে অভিযোগ উঠল,

সে বিষয়ে কোনো তদন্ত হলো না। যদিও সব অভিযোগ সেই ইউএনও অস্বীকার করেছিলেন। এক মাস না যেতেই তার বদলির আদেশ জারি হলো। তার বদলির এই আদেশ স্থানীয় জনগণের মনে প্রশ্নের জন্ম দিল যে, ছাগলকাণ্ডের জন্যই কি তাকে বদলি করা হয়েছে?

এখন সরকারি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অভিযোগ আসলে কোনো তদন্ত হচ্ছে না। তদন্ত যদিও হয়, শাস্তি হিসেবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জের ইউএনও আরিফা জহুরা ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চাওয়ার জন্য এক অসহায় মানুষকে কঠোর শাস্তি দিয়েছিলেন।

যে লোকটা নিজেই খাদ্য সংকটের জন্য ৩৩৩ নম্বরে ফোন দিলেন, সেই লোকের শাস্তি হলো ১০০ জন গরিব মানুষকে খাবার কিনে দেওয়ার। মানুষটি জেল বা লোকলজ্জার ভয়ে অনেক কষ্টে, বাড়ির গহনা বিক্রি করে সেই আদেশ পালন করলেন। যে ঘটনা ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ইউএনও’র কাছে তথ্য ছিল খাদ্য চাওয়া লোকটি ধনী মানুষ। চারতলা বাড়ি আর হোসিয়ারি কারখানার মালিক। পরে যখন দেখা গেল, লোকটি আসলেই দুর্দশাগ্রস্ত ছিলেন এবং তার সত্যিই খাদ্যের দরকার ছিল, তখন সেই খাদ্য কেনার টাকা (৬০ হাজার) তাকে ফেরত দেওয়া হলো। সেই সঙ্গে জেলা প্রশাসন একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করল।

তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্তে ইউএনও আরিফা দায়মুক্তি পেলেন। দায়ী করা হলো একজন ইউপি সদস্যকে। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, সামান্য সময়ের পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মানুষকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দেওয়া শাস্তি অনেক সময় বড় ভুল হতে পারে। এতে বিচার ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যেও অনাস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, সেই শাস্তি দেওয়া ইউএনও কেন দায়মুক্তি পেলেন, যখন তিনি ছিলেন শাস্তি দেওয়ার নির্বাহী ব্যক্তি। আবার বগুড়ার ক্ষেত্রে কেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকার পরেও জেলা প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করে দেখল না? কেন তাকে বদলি করে আবার একটি অলিখিত দায়মুক্তি দেওয়া হলো?

বর্তমান সময়ে সরকারি কোনো কর্মচারী-কর্মকর্তা কোনো অপরাধ করলে, সে বিষয়ে সঠিক কোনো তদন্ত না করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অনেক সময় তদন্ত হলেও দেখা যায়, অন্যায়কারী কোনো না কোনোভাবে দায়মুক্তি পেয়ে যান। বগুড়া ও নারায়ণগঞ্জের

এই দুই ঘটনাই এই দাবি প্রমাণ করে। একজন ইউএনও অপরাধ করলে কি তার শাস্তি হবে না? যেকোনো সরকারি কর্মচারী বা কর্মকর্তা যদি দোষ করে থাকেন, তবে তাকে শাস্তি না দিলে কি সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না? নাকি তাকে যে কোনোভাবে দায়মুক্তি দিলে সরকারের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন থাকে?

সত্য তো এই, কোনো ব্যক্তি সে যেই হোক, যদি অন্যায় করে তাকে দোষী প্রমাণ করলে বা শাস্তির আওতায় আনলে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না বরং সরকারের ভাবমূর্তি আরও বাড়ে। আর যদি এর উল্টোটা ঘটে, তবে মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা এবং অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা চলে আসে।

বগুড়ার ছাগলকাণ্ডের জন্য সীমা শারমিনকে বদলি করে তাকে এক ধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কারণ, এখানকার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন মনে রাখবে যে, কোনো ছাগল যদি ফুল গাছের পাতা খায়, তবে তাকেও কঠিন শাস্তি দিতে পারেন প্রবল ক্ষমতাধর ইউএনও। সীমা শারমিন যতদিন বগুড়ায় থাকতেন, ততদিন এই ঘটনাটি তার মর্মপীড়ার কারণ হয়ে থাকত। এখন অন্য জায়গায় বদলি হয়ে তিনি প্রকৃতপক্ষে মানসিকভাবেও দায়মুক্তি পেলেন।

সীমা শারমিন যদি দোষ না করবেন তবে কেন সেই ছাগল ফিরিয়ে দিয়ে জরিমানার টাকা নিজে শোধ করবেন? কেবল সমালোচনার জন্যই ইউএনও আরিফা বা শারমিনের জরিমানা বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের শাস্তি ফিরিয়ে নেওয়া হয়, তবে এভাবে শাস্তির বিধান রেখে জনগণের সমালোচনা কুড়ানোর কি কোনো দরকার আছে?

About Admin

Check Also

এই মাত্র পাওয়া: ইসলামি বক্তা আবু ত্বহা মোহাম্মদ আদনানের খোঁজ পাওয়া গেছে!

ইসলামি বক্তা আবু ত্বহা মোহাম্মদ আদনানকে খোঁজ পাওয়া গেছে। তিনি রংপুরের নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছেন। …