তিন দিনে চার মামলা, তবু যে কারণে গ্রেফতার হননি মামুনুল হক

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’র কেন্দ্রী যগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক-এর বিরুদ্ধে গত তিন দিনে আলাদা ৪টি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ ও দুই ভুক্তভোগী। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে হোটেলকাণ্ড ও হেফাজতের তাণ্ডবের জন্য দায়ী করে মামলাগুলো হয়েছে।

এসব মামলার কোনোটিতে মাওলানা মামুনুল হককে হুকুমের আসামি আবার কোনোটিতে প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা হিসেবে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এতগুলো মামলায় আসামি হয়েও এখনো কেন গ্রেফতার হননি মামুনুল? বিভিন্ন মহল থেকে উঠছে এমন প্রশ্ন।

মামলার সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মামুনুল হকের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলোর প্রাথমিক তদন্ত চলছে। তদন্তে তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তবেই গ্রেফতার করা হবে। তার আগে নয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররমে গত ২৬ মার্চ পুলিশের সাথে হেফাজতকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এই ঘটনায় হেফাজতে ইসলাম নেতা মামুনুল হকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে গত ৫ এপ্রিল রাতে পল্টন মডেল থানায় বিস্ফোরক আইনে মামলা

দায়ের করেন রাজধানীর ওয়ারীর বাসিন্দা টাইলস ব্যবসায়ী খন্দকার আরিফ-উজ-জামান। বায়তুল মুকাররমে সংঘর্ষের ঘটনায় তিনি আহত হয়েছেন দাবি করে মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মাওলানা মামুনুল হকের নির্দেশে ওই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আক্রমণকারীরা তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন- মাওলানা ফলায়েদ আল হাবিব (যুগ্ম-মহাসচিব), মাওলানা লোকমান হাকিম (যুগ্ম-মহাসচিব), নাসির উদ্দিন মনির (যুগ্ম-মহাসিচব), মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া (নায়েবে আমির), মাওলানা নুরুল ইসলাম জেহাদী (মাথজান, ঢাকা), মাজেদুর রহমান (নায়েবে আমির, ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মাওলানা হাবিবুর রহমান (লালবাগ, ঢাকা),

মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মাওলানা জসিম উদ্দিন (সহকারী মহাসচিব, লালবাগ), মাওলানা মাসুদুল করিম (টঙ্গী, সহ-সাংগঠনিক), মুফতি মনির হোসাইন কাশেমী (অর্থ সম্পাদক), মাওলানা যাকারিয়া নোমান ফয়েজী (প্রচার সম্পাদক) মাওলানা ফয়সাল আহমেদ (মোহাম্মদপুর, ঢাকা), মাওলানা মুশতাকুন্নবী (সহকারী দাওয়াহ সম্পাদক), মাওলানা হাফেজ মো. জোবারের (ছাত্র ও যুব সম্পাদক) এবং মাওলানা হাফেজ মো. তৈয়ব (দপ্তর সম্পাদক)।

এ মামলায় উল্লেখিত আসামিদের কাউকেই (এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত) গ্রেফতার করেনি পুলিশ। ৫ এপ্রিল রাতে বাংলাভিশন ডিজিটালকে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর ছিদ্দিক জানিয়েছিলেন, মামলা হয়েছে। প্রাথমিত তদন্তে আসামিদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে গ্রেফতার করা হবে।

ওসির এমন বক্তব্যের পর কেটে গেছে দুদিন। একই বিষয়ে ৭ এপ্রিল রাতে ফোন করলে তিনি বলেন, গ্রেফতারের প্রক্রিয়া চলছে। তবে এই ‘প্রক্রিয়া’ বলতে এখনও তদন্ত কাজ চলছে নাকি গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে- তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

এদিকে র‍য়্যাল রিসোর্ট-এর ঘটনার পর ৪ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ধর্মের নামে অধর্মের কাজ যারাই করবে, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সেদিন সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, রিসোর্ট-এ মামুনুলের সংগে থাকা নারী তাঁর স্ত্রী নন। এ বিষয়ে আরও ঘটনা জেনে সবাইকে জানাবো। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরে ওই ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত জানাননি। হেফাজতের তাণ্ডবের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা তদন্ত করে দেখছি। যারাই তাণ্ডব করে থাকুক তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছি।

পল্টন থানায় মামলার একদিন পর ৬ এপ্রিল রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানা পুলিশ বাদী হয়ে দু’টি মামলা দায়ের করেছে। এই দু’টি মামলায় ৮৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৫০০-৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রধান আসামি মামুনুল হক। বাকি আসামিরা স্থানীয় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী। একই সময় স্থানীয় এক সাংবাদিক বাদী হয়ে আরেকটি মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলাতেও মামুনুল হককে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশের দায়ের করা দু’টি মামলার একটি হয়েছে গত ৩ এপ্রিল সোনারগাঁওয়ের রয়্যাল রিসোর্ট-এ মামুনুল হককে একজন নারীসহ অবরুদ্ধ করার পর উদ্ভুত পরিস্থিতিতে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের উপর হেফাজতের নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনায়।

অপরটি হয়েছে- সেদিন হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগে। আর ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একজন সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনায় অপর মামলাটি দায়ের করা হয়। কিন্তু এসব মামলার আসামিদের পুলিশ এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি।

নারায়ণগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, ‘সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনায় স্থানীয় হেফাজতে ইসলামের সমর্থক একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ তবে তিনি তার নাম জানাতে পারেননি।এসপি জায়েদুল আলম জানান, পুলিশের দায়ের করা দু’টি মামলার প্রাথমিক তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না করে গ্রেফতার করা হবে না বলেও জানান তিনি।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, হেফাজতের মামলাগুলোতে উল্লেখিত আসামিদের বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমনকি মামুনুল হক যে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন মোহাম্মদপুরের সেই জামিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসাতেও নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, হোটেলকাণ্ডের পর মামুনুল হক আর বাসায় ফেরেননি। উল্টো তাঁর বাসায় অবস্থান করা প্রথম স্ত্রী চার সন্তান নিয়ে মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের ওই বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন গত তিনদিন আগে।

আর ওই কাণ্ডের পর মাঝে মাঝে ফেসবুকে এসে বিভিন্ন বার্তা দিলেও মামুনুল হক বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন তা অনেকটাই অস্পষ্ট। তাঁর ব্যবহৃত নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া গেছে।তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, মামলার পর থেকে গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন মামুনুল হক।

About Nasim

Check Also

মামুনুলকে মুক্তি না দিলে কঠোর কর্মসূচি আসছে !

হেফাজত নেতা মামুনুল হকের মুক্তির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। অবি;লম্বে তাকে মুক্তি না দিলে …